বুড়িগঙ্গায় লঞ্চ ডুবি ১২ ঘণ্টা পর একজনকে জীবিত উদ্ধার!

রাজধানীর শ্যামবাজার এলাকা সংলগ্ন বুড়িগঙ্গা নদীতে অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে লঞ্চডুবির ১২ ঘণ্টার পর এক ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। আজ সকাল ১০টায় এ লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটে।

লঞ্চডুবির প্রায় ১২ ঘন্টা পর সোমবার (২৯ জুন) রাত ১০টার দিকে লঞ্চটি উদ্ধারের সময় এই লোককে ভেসে উঠতে দেখে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল। এরপর দ্রুত তাকে উদ্ধার করে পাশের একটি নৌকায় তোলা হয়। এবং লাইফ জ্যাকেট পরিয়ে তার দেহের তাপমাত্রা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হয়। তার ঠোঁঠের কোনে হালকা রক্তের আভা দেখা গেছে।

উদ্ধার ব্যক্তিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেয়া হচ্ছে। তবে, তাৎক্ষণিকভাবে তার নাম পরিচয় জানা যায়নি।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাত ১০টার দিকে লঞ্চটি উদ্ধারের সময় এই লোককে ভেসে উঠে। লঞ্চের এককোনা ভেসে উঠলেই তিনি সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন। কিন্তু লঞ্চের টিউবটি ফেটে যাওয়ায় লঞ্চটি আবার তলিয়ে গেছে।

এদিকে সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, লঞ্চডুবির ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩২ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪ জন শিশু ৮ মহিলা ও ২০ পুরুষ। বেলা সোয়া ১২টার দিকে ঘটনাস্থল থেকে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসাইন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) চেয়ারম্যান গোলাম সাদেক জানান, ময়ূর–২ নামের একটি লঞ্চ সদরঘাট লালপট্টি থেকে চাঁদপুরের দিকে যাচ্ছিল। ওই লঞ্চটি মর্নিং বার্ডকে ধাক্কা দেয়। এতে মর্নিং বার্ড নামের লঞ্চটি ডুবে যায়।

বিআইডব্লিউটিএর ঢাকা নদীবন্দরের যুগ্ম পরিচালক এ কে এম আরিফউদ্দিন জানান, ধাক্কা দেয়া লঞ্চ ময়ূর–২ জব্দ করা হয়েছে। তবে লঞ্চের চালক পালিয়ে গেছেন।

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ওসি মো. শাহ জামাল জানান, উদ্ধার করা লাশের মধ্যে পুরুষ ২০ জন। নারী ৮ জন ও শিশু ৪টি।

বিআইডব্লিউটিএর উদ্ধারকারী জাহাজ প্রত্যয় নারায়ণগঞ্জ থেকে ঘটনাস্থলের দিকে রওনা হয়েছে। তবে, এটি আসতে আরো কিছু সময় লাগবে বলে জানা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে সন্ধ্যা নাগাদ ডুবে যাওয়া লঞ্চ উদ্ধারের কাজ শুরু হবে। বর্তমানে ঘটনাস্থলে নৌবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও নৌপুলিশ উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঢাকা-চাঁদপুর রুটের ময়ূর-২ নামের একটি লঞ্চের ধাক্কায় কমপক্ষে ৫০ যাত্রী নিয়ে ঢাকা-মুন্সিগঞ্জ রুটের মর্নিং বার্ড লঞ্চটি ডুবে যায়। লঞ্চটি থেকে কয়েকজন যাত্রী সাঁতরে পাড়ে উঠলেও বেশ কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন।

আরো পড়ুন-লঞ্চডুবির সময় শিশুসন্তানকে আঁচলে বাঁধলেন মা

মায়ের চেয়ে আপন কেউ নয়। সন্তানের জীবনের সবচেয়ে বড় ঠিকানা মায়ের আঁচল। এই আঁচলে আছে মমতাময়ী মায়ের ভালোবাসা। এজন্যই সন্তান মায়ের আঁচলে মুখ লুকায়। মায়ের আঁচলে চোখের পানি মোছেনি এমন সন্তান নেই। বিপদ কিংবা কারও হাত থেকে বাঁচতে দৌড়ে এসে মায়ের আঁচলে লুকায় সন্তান। পরম মমতায় সন্তানকে আগলে রাখেন মাও।

এতটা আস্থা আর ভরসা থেকেই মায়ের আঁচলে আশ্রয় নিয়েছিল আট বছরের সিফাত। সন্তানকে বাঁচাতে আঁচল পেতে দিয়েছেন মা। আদরের সন্তানকে আঁচলে পেঁচিয়ে বুড়িগঙ্গায় ডুবে যান মা। হয়তো আশা ছিল, নিজে মারা গেলেও সন্তান বেঁচে যাবে। কিন্তু বিধিবাম। একসঙ্গে মা-সন্তান দুজনই নদীতে ডুবে মারা গেলেন।

বলছিলাম সোমবার (২৯ জুন) রাজধানীর শ্যামবাজার এলাকা সংলগ্ন বুড়িগঙ্গা নদীতে অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে লঞ্চডুবির ঘটনার কথা। এ পর্যন্ত ৩২ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে মায়ের আঁচলে পেঁচানো এক সন্তানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

ওই সন্তানের নাম সিফাত (৮)। তার মায়ের নাম হাসিনা বেগম (৩৫)। মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার আবদুল্লাহপুর গ্রামের আইনজীবী আব্দুর রহমানের (৪৮) স্ত্রী হাসিনা বেগম। লঞ্চডুবির ঘটনায় একসঙ্গে স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যু হয়েছে। হাসিনা বেগম ও ছেলে সিফাতের মরদেহ উদ্ধার করা হলেও আব্দুর রহমানের মরদেহ পাওয়া যায়নি।

আব্দুর রহমান ঢাকার জজ কোর্টে কর্মরত ছিলেন। ঢাকায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করলেও করোনায় লকডাউনের কারণে কোর্টের কাজকর্ম বন্ধ থাকায় কয়েক মাস ধরে গ্রামের বাড়ি টঙ্গিবাড়ী উপজেলার আবদুল্লাহপুর গ্রামে ছিলেন।

রোববার (২৯ জুন) সকালে মুন্সিগঞ্জের মীরকাদিম থেকে মর্নিং বার্ড লঞ্চযোগে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ঢাকায় ফিরছিলেন আব্দুর রহমান। রাজধানীর শ্যামবাজার এলাকা সংলগ্ন বুড়িগঙ্গা নদীতে অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে লঞ্চটি ডুবে যায়। সোমবার দুপুরে স্ত্রী-সন্তানের মরদেহ উদ্ধার করা হলেও সন্ধ্যা পর্যন্ত আব্দুর রহমানের মরদেহ পাওয়া যায়নি।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, যখন হাসিনা বেগমের মরদেহ নদী থেকে উঠানো হয় তখন শাড়ির আঁচলে পেঁচানো ছিল শিশুপুত্র সিফাতের মরদেহ। বিষয়টি দেখে বিস্মিত হন সবাই।

হাসিনা বেগমের ভাই রবিন বলেন, আপার শাড়ির আঁচলে পেটের সঙ্গে বাঁধা ছিল ভাগনে সিফাত। হয়তো আপা বিপদ বুঝে ভাগনেকে আঁচলে বেঁধেছেন আগেই। কিন্তু মা-ছেলে কেউ বাঁচল না। দুজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দুলাভাইয়ের মরদেহ পাওয়া যায়নি এখনও।

টঙ্গিবাড়ী উপজেলার আবদুল্লাহপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন নয়ন বলেন, আবদুল্লাহপুর গ্রামের ওই তিনজন ছাড়াও লঞ্চডুবির ঘটনায় আরও দুজন নিহত হয়েছেন। তারা হলেন হালিম মুন্সির ছেলে মনিরুজ্জামান (৪২) এবং ফজল ব্যাপারীর ছেলে সুমন ব্যাপারী (৩২)। মনিরুজ্জামানের মরদেহ পাওয়া গেলেও সুমন ব্যাপারীর মরদেহ পাওয়া যায়নি।

এদিকে একই লঞ্চডুবিতে টঙ্গিবাড়ী উপজেলার বায়হাল গ্রামের চারজন, কামাড়খাড়া গ্রামের দুজন এবং হাটকান গ্রামের দুজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে টঙ্গিবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাসিনা আক্তার বলেন, আমার কাছে এখন পর্যন্ত লঞ্চ দুর্ঘটনায় মৃতদের কোনো তথ্য নেই।